পুরাতন ল্যাপটপ কেনার আগে যে বিষয়গুলো জানতেই হবে।

পুরাতন ল্যাপটপ কেনার আগে করনীয়ঃ                                                                                                                                   

 দৈনন্দিন কাজ ফ্রিল্যান্সিং বা অফিসিয়াল কাজের জন্য আমাদের একটি পিসি বা ল্যাপটপের প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে আমাদের অনেকেরই সামর্থ্য থাকে না নতুন একটি ল্যাপটপ কেনার।

 তাই অনেকেই আমরা কম দামের মধ্যে ল্যাপটপ খোঁজ করি, কম দামে পুরাতন বা রিকন্ডিশন ল্যাপটপ কিনতে গিয়ে আমরা প্রায়ই প্রতারণার শিকার হয়, তাই আমরা আজকে জানব পুরাতন ল্যাপটপ কেনার আগে যে বিষয়গুলো অবশ্যই জানা দরকার সেই সম্পর্কে যাতে করে প্রতারিত হওয়ার সুযোগ না থাকে। 


১। আপনি কি ধরনের কাজের জন্য ল্যাপটপ ব্যবহার করবেন সেটি আগে নির্বাচন করুন 

আমাদের মধ্যে অনেকেই আছে আমরা কিছু না জেনেই ল্যাপটপ কেনার জন্য আগ্রহী হয়ে যায় কিন্তু কোন ল্যাপটপ কেনার আগে যদি এটা নির্বাচন করা যায় যে আমি কোন কাজের জন্য ল্যাপটপ ব্যবহার করব, তাহলে ল্যাপটপ কেনার প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়ে যায়। যদি কেউ আমার কাছ থেকে পরামর্শ চাই তাহলে আমি তাকে বলি সর্বপ্রথম আপনি ঠিক করুন যে আপনি কি ধরনের কাজের জন্য ল্যাপটপ কিনতে চান।

ধরুন আপনি দৈনন্দিন কাজ বা অফিসিয়াল কাজকর্মের জন্য ল্যাপটপ ব্যবহার করতে চান সে ক্ষেত্রে আপনি মোটামুটি মানের একটি প্রসেসর এবং র‍্যাম ব্যবহার করে অনায়াসে এরকম বেসিক কাজকর্ম করতে পারেন। আবার যদি আপনি ল্যাপটপে গেম খেলতে আগ্রহী হন তাহলে আপনার উচিত হবে একটি ভালো গ্রাফিক্স কার্ড এবং উচ্চ মানের র‍্যাম সম্পন্ন একটি ল্যাপটপের। 

আর যদি আপনি ল্যাপটপটি টিভি শো কিংবা ডিজিটাল শো দেখার জন্য ব্যবহার করতে চান তাহলে একটি এলইডি বা হাই রেজুলেশনের একটি ডিসপ্লে সম্পন্ন ল্যাপটপ আপনাকে নিতে হবে । ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেই বিভিন্ন ওয়েব সিরিজ কিংবা টিভি শো দেখার জন্য ল্যাপটপ ব্যবহার করে থাকি। ল্যাপটপের স্ক্রিন যদি ঘোলাটে হয় তাহলে টিভি শো কিংবা সিরিজ দেখে মজা আসবে না সে ক্ষেত্রে একটি ভালো ডিসপ্লে আপনার ডিজিটাল শো এক্সপেরিয়েন্স বাড়িয়ে দেবে। 

যদি প্রসেসরের কথা বলা যায় তাহলে আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো চতুর্থ জেনারেশন এর আগের প্রসেসর গুলো ব্যবহার না করাই বুদ্ধিমানের কাজ হব। কেননা চতুর্থ জেনারেশনের আগের প্রসেসর গুলো ব্যবহার করলে আপনি অনেক ডিজিটাল অ্যাপলিকেসশন সেবা সঠিকভাবে রান করাতে পারবেন না। পুরাতন ল্যাপটপ কেনার আগে আরেকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে সেটি হল, ল্যাপটপটি যাতে কোনভাবে পাঁচ বছরের বেশি ব্যবহৃত না হয়। 

আপনি যদি ল্যাপটপ দিয়ে বেসিক লেভেলের কাজকর্ম করতে চান তাহলে ইন্টেল এর ১১ তম জেনারেশন আপনার জন্য যথেষ্ট হবে বলে আমি মনে করি আর যদি ‍্যামের কথায় আসি তাহলে প্রাথমিক অবস্থায় সর্বনিম্ন ৮ জিবি র‍্যাম বা যদি ষোল জিবি র‍্যাম নেওয়ার সুযোগ থাকে তাহলে এটাই আপনার জন্য যথেষ্ট।

২. নির্ভরযোগ্য বিক্রয় সোর্স খুঁজুন

পুরাতন ল্যাপটপ কেনার ক্ষেত্রে অনেকেই প্রতারণার শিকার হয়ে থাকেন কেননা বাংলাদেশ সাধারণত বিদেশ থেকে যে শিপমেন্ট হয়ে ল্যাপটপ আসে সেগুলো বেশিরভাগই ব্যবহৃত বা রিকন্ডিশন ল্যাপটপ। অনেক অসাধু ব্যবসায়ী পুরাতন পার্টসংকলিত করে ল্যাপটপ মেরামত করে চালান করে দিতে পারে তাই পুরাতন ল্যাপটপ কেনার ক্ষেত্রে কিছুটা ঝুঁকি থেকে যায় তবে কিছু টেকনিক অবলম্বন করলে এই ধরনের ঝুঁকি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।

আমার বাস্তবিক অভিজ্ঞতা অনুযায়ী পুরাতন ল্যাপটপ কখনোই অনলাইন এর মাধ্যমে কিনবেন না। চেষ্টা করবেন যাতে দোকানে গিয়ে দেখেশুনে পরীক্ষা করে ল্যাপটপটি নিতে পারে। বর্তমানে ঢাকার মিরপুর ১০, এলিফ্যান্ট রোড বা উত্তরায় অনেক বিশ্বাসযোগ্য পুরাতন ল্যাপটপের শোরুম রয়েছে; যেখানে গেলে আপনি দেখে শুনে গ্যারান্টি সহকারে পুরাতন ল্যাপটপ ক্রয় করতে পারেন।

এই সকল দোকান বা শোরুমের ওয়েবসাইটের ঠিকানা ইন্টারনেটে সার্চ করলেই পেয়ে যাবেন। চেষ্টা করবেন এই সকল শোরুমের দোকানদারদের সাথে কানেক্টেড থাকার কাজেই যখনই নতুন শিপমেন্ট শোরুমে ঢুকবে সাথে সাথে যেন আপনি খবর পেয়ে যান এবং সবার আগে আপনার কাঙ্খিত ল্যাপটপটি সংগ্রহ করতে পারেন। 

৩। বর্তমান বাজারদরের সাথে দামের তুলনা করুন

 ল্যাপটপ কেনার সময় ল্যাপটপের মধ্যে কোন ধরনের হার্ডওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছে তার সাথে বর্তমান বাজার মূল্যের হার্ডওয়ারের মূল্য তুলনা করুন। যদি নতুন মূল্য সামান্য বেশি হয় তাহলে আমার মতে পুরাতন  না কেনাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কারণ আপনি যদি বিক্রেতাকে বর্তমান বাজার দর সম্পর্কে ধারণা দিতে পারেন তাহলে হয়তো বিক্রেতা আপনার ল্যাপটপে দাম কিছুটা কমিয়ে রাখতে পারে।

পুরাতন ল্যাপটপ কেনার সময় অবশ্যই করনীয়

আপনি যদি সামনা সামনি বা কোন শোরুম থেকে পুরাতন ল্যাপটপ কেনার কথা ভাবেন তাহলে নিচের টিপসগুলো শুধুমাত্র আপনার জন্য,

৪। ল্যাপটপের পোর্ট ক্ষত বা ভাঙ্গা আছে কিনা দেখে নিন

পুরাতন ল্যাপটপের ক্ষেত্রে অনেক সময় পোর্ট গুলো ভাঙ্গা বা পিন বাকা হয়ে থাকতে পারে এগুলো দেখেই বুঝতে হবে যে ল্যাপটপটি ভালোভাবে ব্যবহার করা হয়নি সুতরাং এ ধরনের ল্যাপটপ কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে।

আরো দেখতে হবে পোর্টের ভেতরে কোন ময়লা বা পিন বাকা আছে কিনা এবং যদি সম্ভব হয় তাহলে প্রত্যেক পোর্টে প্লাগ ইন করে চেক করতে হবে যে সবগুলো ঠিকমতো কাজ করছে কিনা।                                                       

৫।  ল্যাপটপের ডিসপ্লে কোয়ালিটি বা রেজুলেশন চেক

আপনি কোন ধরনের রেজুলেশন এর ল্যাপটপ কিনতে চান সেটা আপনার আগে জানার কথা। সেই অনুযায়ী বা বিক্রেতার বিজ্ঞাপনের বিপরীতে আপনাকে ডিসপ্লেটি যাচাই করে নিতে হবে। ডিসপ্লেটির ব্রাইটনেস একদম হাই করে দেখুন আপনার চাওয়ার সাথে মিল আছে কিনা; আরো পরীক্ষা করুন ব্যাকলাইট এবং ডেড পিক্সেল ঠিক আছে কিনা ।

আরো ভালো হয় যদি ল্যাপটপ থেকে কোন ব্রাউজারে গিয়ে একটি সাদা স্ক্রীন ওপেন করতে পারেন এবং সেখানে যদি কোথাও উজ্জ্বল বা কোথাও অনুজ্জ্বল বা যদি কাঁপার মতো লাগে তাহলে এ ধরনের ল্যাপটপ কেনা থেকে বিরত থাকুন।

৬. টাচপ্যাডটি ভালো আছে কিনা যাচাই করুন

পুরাতন ল্যাপটপের ক্ষেত্রে খুব সহজে টাচপ্যাডের মধ্যে একটি নষ্ট বাটন বা আঠা দিয়ে যুক্ত করা বাটন লেগে থাকতে পারে, সে ক্ষেত্রে যাচাই করার জন্য আপনি একটি নতুন নোটপ্যাড পেজ খুলুন। সেখানে প্রত্যেকটি বাটন প্রেস করে দেখুন সবগুলো ঠিক আছে কিনা; আরো দেখুন কোন বাটন দেবে আছে কিনা বা জট হয়েছে কিনা। যদি ল্যাপটপের কিবোর্ড ব্যাকলাইট থাকে তাহলে সেটিও চেক করে দেখুন যে ঠিকমতো কাজ করছে কিনা। 

৭। ওয়েবক্যাম এবং স্পিকার কোয়ালিটি যাচাই করুন

ল্যাপটপের ওয়েবক্যাম অংশটি চালু করুন এবার দেখুন ক্যামেরা ঠিকমতো কাজ করছে কিনা, ভালো পিকচার কোয়ালিটি বা কোন ঝাপসা আছে কিনা লক্ষ্য করুন।  এর পাশাপাশি স্পিকার বা সাউন্ড কোয়ালিটি পরীক্ষা করার জন্য কোন অডিও বা ভিডিও প্লে করুন। অনেক সময় পুরাতন ল্যাপটপে কোন অডিও বা ভিডিও থাকে না সে ক্ষেত্রে আপনি ওয়াইফাই লগইন করে ইউটিউব থেকে পরীক্ষা করুন।

 অথবা আপনি যদি বাইরে কোথাও থেকে নিতে চান তাহলে সাথে করে কিছু ফাইল নিয়ে যান যাতে পরীক্ষা করা সহজ হয়। যদি পরিষ্কার সাউন্ড কোয়ালিটি না পান তাহলে সেই ল্যাপটপটি কেনা থেকে বিরত থাকুন। 

৮। ল্যাপটপের ব্যাটারি স্ট্যাটাস চেক করুন

ল্যাপটপের ক্ষেত্রে ব্যাটারি অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিশেষ করে পুরাতন ল্যাপটপের ক্ষেত্রে ব্যাটারি কোয়ালিটি কিছুটা কম থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে 70 থেকে 80 পার্সেন্ট ব্যাটারি কোয়ালিটির নিচে ল্যাপটপ কেনা থেকে বিরত থাকবেন।

Cycle count test: সাইকেল কাউন্ট বলতে বোঝায়, সাধারণত একটি ব্যাটারি( ০% থেকে ১০০%) কতবার চার্জ করা হয় সেটা।  যে ব্যাটারির সাইকেল কাউন্ট যত কম সে ব্যাটারিতে তত ভালো। সাধারণত ১ থেকে ৫০০ পর্যন্ত সাইকেল কাউন্ট থাকলে সেই ব্যাটারিকে ভালো ব্যবহারযোগ্য ব্যাটারি হিসেবে বিবেচনা করা হয় । আপনি যে কোন ব্রাউজারে গিয়ে ল্যাপটপের ব্যাটারির সাইকেল কাউন্ট টেস্ট যাচাই করতে পারেন।

আপনি যদি এসব কিছু না পারেন তাহলে ল্যাপটপটি একটানা ৩০ থেকে ৪০ মিনিট ব্যবহার করুন। এরই মধ্যে ল্যাপটপের ব্যাটারি সক্ষমতা সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা পেয়ে যাবেন। এই সময়ে যদি ব্যাটারির ক্ষমতা দ্রুত ফুরিয়ে যায় তাহলে বুঝবেন ব্যাটারীতে কোন সমস্যা রয়েছে সে ক্ষেত্রে এই ধরনের ল্যাপটপ কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে। 

৯। মানি রিসিপ্ট বা ওয়ারেন্টির তথ্য বুঝে নিন

আপনি যেহেতু পুরাতন ল্যাপটপ কিনছেন সেহেতু ওয়ারেন্টি বিষয়টি বুঝে নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পুরাতন ল্যাপটপ কেনার ক্ষেত্রে দোকানদাররা সাধারণত ১৫ থেকে ৩০ দিনের একটি মানিব্যাগ গ্যারান্টি দিয়ে থাকে। আপনি সেই মানিব্যাগ গ্যার ান্টি লিখিতভাবে মানি রিসিপ্টের উপরে লিখে নিন এবং ল্যাপটপটি কতদিনের ওয়ারেন্টি বা ফ্রি রিপেয়ারিং সার্ভিস দিবে সেই বিষয়েও খোলাসা করে নিন।  

১০। শেষ কথা 

পুরাতন ল্যাপটপ কেনার ক্ষেত্রে কিছুটা ঝুকি থেকেই থাকে তবে আপনি যদি সঠিকভাবে এবং কিছু কৌশল অবলম্বন করে পুরাতন ল্যাপটপ কিনতে পারেন তাহলে আপনার জন্য একটি ভালো সুযোগ রয়েছে ;এতে করে আপনার টাকাও কম খরচ হবে আবার আপনার ল্যাপটপটির কোয়ালিটি ভালো হবে।

তবে আমার ব্যক্তিগত মতামত, যদি আপনার বাজেট থাকে তাহলে অবশ্যই দেখেশুনে একটি নতুন ল্যাপটপ নেয়ায় বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আর যদি আপনার বাজেটের পরিমাণ কম হয় তাহলে উপরের বর্ণিত উপায়ে ভালোভাবে যাচাই করে পুরাতন ল্যাপটপ কিনতে পারেন। 


এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url